শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

ড. বি এম শহীদুল ইসলাম

ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশি রাষ্ট্র। কিন্তু বরাবরই লক্ষ্য করছি যে, দেশটি আমাদের প্রতি একের পর এক আগ্রাসন ও আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে গভীর ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করে পালানোর পর ভারত তাকে আশ্রয় দেয়াসহ নানা রকমের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের এমন আধিপত্যবাদী নীতি নতুন নয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের প্রতি ভারতের লোক দেখানো সমর্থন ছিল। বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক সম্পদ ও কলকারখানা দখল করে নিজেদের করায়ত্ত করা ছিলো আসল উদ্দেশ্য। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছরে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশের যেসব ক্ষতিসাধন করেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে সহযোগিতার নামে যুদ্ধ চলাকালীন মাত্র ৯ মাসে এবং তৎপরর্তী সময়ে এর চেয়েও অনেক বেশি সম্পদ চুরি ও লুণ্ঠন করেছে। যুদ্ধাবস্থা ও গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতির সুযোগে আমাদের দেশের বেশির ভাগ বড় বড় কলকারখানার মেশিনগুলো সহজে তারা পাচার করে নিজেদের সম্পদ বানিয়ে নিয়েছে।
এশিয়ার সর্ববৃহৎ চিরুনির কল ছিল যশোরে। সেটিও তারা অতি সন্তর্পণে ভারতে পাচার করে নিজস্ব সম্পদে পরিণত করেছে। শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বা পরবর্তী সময়ই নয়, তার অনেক পূর্ব থেকেই বাংলাদেশের প্রতি ভারতের অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়িত, আগ্রাসী মনোভাব ও আধিপত্যবাদী চেতনা দানা বেঁধে ছিল এবং তারা এখনো অব্যাহতভাবে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। অথচ তারা বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশি হিসেবে সহযোগিতা করার কথা। কিন্তু তার পরিবর্তে বরাবর এমন সব কর্মকান্ড করেছে যাতে করে এদেশের মানুষ বারবার বিপন্ন জাতিতে পরিণত হয়েছে।
আমাদের তিন দিক দিয়ে ঘেরা ভারত আন্তর্জাতিক আইন-কানুন উপেক্ষা করে উজানে বাঁধ নির্মাণ ও শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশকে মরুভূমি এবং বর্ষা মৌসুমে ইচ্ছা মতো পানি ছেড়ে দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, বগুড়া, দিনাজপুর, চুয়াডাঙ্গাসহ অনেক জেলায় আর্সেনিক ব্যাপকভাবে ক্ষতিসাধন করছে। এসব অঞ্চলে প্রায় ৭৫ শতাংশ টিউবওয়েলে আর্সেনিক সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মানুষ স্বাভাবিক খাবার পানিটুকুও পান করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রায় ৬০টি জেলার ২৭১টি উপজেলায় প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি মানুষ আর্সেনিক আতঙ্কে রয়েছে। নদীর পানি কমে যাওয়ায় কৃষি সেচ, ফসল উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। শিল্প-বাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ধারাবাহিকভাবে। উত্তরাঞ্চলের পদ্মা, যমুনা, তিস্তা নদী এখন প্রায় সারা বছরই শুকিয়ে থাকে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ১০টি জেলা খরা মৌসুমে মাঠঘাট শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। অপরপক্ষে বর্ষা মৌসুমে প্রায় প্রতিবছর বন্যায় ব্যাপকভাবে ফসল, গবাদি পশু ও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে করে কৃষকগণ ক্রমান্বয়ে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। দেশের পশ্চিম সীমান্তে ১৯ মাইল উজানে ফারাক্কা নামক স্থানে ১৯৬১ সালে ভারত বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করে। ১৯৭৪ সাল থেকে ফিডার ক্যানেল পরীক্ষা করার কাজ শুরু করলেও তাদের পরীক্ষা আজও পর্যন্ত সমাপ্ত হচ্ছে না বরং পরীক্ষার নামে প্রতি বছর বর্ষাকালে ফারাক্কা বাঁধ খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে ডুবিয়ে মারা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করতে তারা কখনো ভুল করে না। তাদের সুবিধা ঠিকই আদায় করে নেয়। ১৯৭৫ সাল থেকে পদ্মা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে শীত মৌসুমে ৪৭ কিউসেক পানি থাকার কথা, কিন্তু বর্তমানে সেটি ধু ধু মরু প্রান্তর। এভাবে ভারত আমাদেরকে কখনো পানিতে মারে, আবার কখনো খরায় মারে। ১৯৭১ সালের পর থেকে সব সরকারই নানা প্রকার চুক্তি স্বাক্ষরসহ অনেক কিছুই করেছে। এগুলো শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই।
১৯৭১ সালের রেকর্ড থেকে জানা যায় নৌপথের দৈর্ঘ ২৪ হাজার কিলোমিটার থাকলেও বর্তমানে তা ৬ হাজার কিলোমিটারে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের অন্যতম আগ্রাসন হচ্ছে সীমান্ত হত্যা। ভারত বিগত বছরগুলোতে সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ২ হাজারেরও অধিক বাংলাদেশের নাগরিককে হত্যা করেছে। অনেক নাগরিককে হত্যা করে লাশ গুম করে দিচ্ছে। ঐসব সন্তানদের মা-বাবা ও পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে চোখের পানি বিসর্জন দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। ভারতীয় আগ্রাসনের আরো উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে ফেলানী হত্যাকান্ড। ফেলানীকে হত্যা করার পর তাকে নির্মমভাবে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। যা কোনোভাবেই বিশ্ববাসীর নজর এড়ানো যায়নি। একজন যুবতী নারীকে এমন লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের মাধ্যমে ভারত প্রমাণ করেছে যে, তারা কতটা আধিপত্যবাদে বিশ্বাসী। অথচ দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও ফেলানী হত্যাকান্ডের বিচারের কোনো সুরাহা হয়নি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এসব হত্যার বিচার করা জরুরি।
স্বাধীনতার পর একথা স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়েছে যে, ভারত কখনো বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারে না। একটি রাজনৈতিক দল ভারতের আসল উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পেরেছিল বলেই ভারত দলটিকে জান-প্রাণের শত্রু বানিয়েছে। ৫৩ বছর আগে ঐ রাজনৈতিক দলের যে উপলব্ধি ছিল, আজ ৫৩ বছর পরে এসে তাদের বিশ্লেষণ সঠিক ছিল বলে মনে করছেন বাংলাদেশের জনগণ। কারণ দেরিতে হলেও তারা বিষয়টি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। ভারত যে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারে বিশ্বাসী তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রমাণ হচ্ছে, নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিলে বাংলাদেশের পক্ষে এমএজি ওসমানীর নয়, জেনারেল অরোরার স্বাক্ষর (?)। ভারত ভালো করেই জানতো, তাদের সহযোগিতা ছাড়াই বাংলাদেশ স্বাধীন হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তারপরও তারা নামকাওয়াস্তে মিত্রতা করেছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যাতে বাংলাদেশের চির শত্রুতা ও সংঘাতময় সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক ফ্যাসিবাদী নীতি, ভারতের বিরামবিহীন আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদ কায়েমের সুযোগ দানের প্রতিবাদ ও জনগণের ওপর অমানবিক অত্যাচর, নিপীড়িত ও জুলুমবাজি নীতির বিরুদ্ধে। আগস্ট বিপ্লবে ছাত্র এবং জনতার সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটানোর মতো বিজয় সম্ভব হলেও ভারতীয় আধিপত্যবাদের মূলোৎপাটন করা এখনো সম্ভব হয়নি।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব বিনির্মাণে জাতি, ধর্ম-বর্ণ, দল-মত, সাদা-কালো, সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ সৃষ্টি না করে নির্বিশেষে সকলেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতের বিরামবিহীন আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদ এবং গভীর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে জাগ্রত হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ প্রাচীর। একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে যুবসমাজকে সাথে নিয়ে দেশ, জাতি, দেশের সম্পদ ও জনগণকে ভারতীয় হিং¯à§à¦° থাবার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করার জন্য এটিই হোক আমাদের বিপ্লবী চেতনার বহি:প্রকাশ।                   লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ